আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম - শাহ আবদুল করিম

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম
গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান
মিলিয়া বাউলা গান ঘাটুগান গাইতাম ।।
বর্ষা যখন হইত গাজির গাইন আইত
রঙ্গে-ঢঙ্গে গাইত আনন্দ পাইতাম
বাউলা গান ঘাটুগান আনন্দের তুফান
গাইয়া সারিগান নাও দৌড়াইতাম ।।
হিন্দু বাড়িন্ত যাত্রাগান হইত
নিমন্ত্রণ দিত আমরা যাইতাম
কে হবে মেম্বার কে হবে গ্রামসরকার
আমরা কি তার খবর লইতাম ।।
বিবাদ ঘটিলে পঞ্চাইতের বলে
গরিব কাঙালে বিচার পাইতাম
মানুষ ছিল সরল ছিল ধর্মবল
এখন সবাই পাগল-বড়লোক হইতাম ।।

করি ভাবনা সেদিন আর পাব না
ছিল বাসনা সুখী হইতাম
দিন হতে দিন আসে যে কঠিন
করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম ।।

সোনার তরী - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা ।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা ।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হলো সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খরপরশা –
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা ।।
একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা –
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা ।।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসী-মাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা –
এপারেতে ছোটো  খেত, আমি একেলা ।।
গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে !
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে ।
ভরা পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙে দু ধারে –
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে ।।
ওগো, তুমি কোথা যাও কোন বিদেশে ?
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে ।
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও –
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে ।।
যত চাও তত লও তরণী-পরে ।
আর আছে–আর নাই, দিয়েছি ভরে ।।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে–
এখন আমারে লহো করুণা করে ।।
ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই–ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি ।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি –
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী ।।

সুখ - কায়কোবাদ


“সুখ সুখ” বলে তুমি, কেন কর হা-হুতাশ,

সুখ ত পাবে না কোথা, বৃথা সে সুখের আশ !

পথিক মরুভূ মাঝে খুঁজিয়া বেড়ায় জল,

জল ত মিলে না সেথা, মরীচিকা করে ছল !

তেমতি এ বিশ্ব মাঝে, সুখ ত পাবে না তুমি,

মরীচিকা প্রায় সুখ, - এ বিশ্ব যে মরুভূমি !

ধন রত্ন সুখৈশ্বর্য কিছুতেই সুখ নাই,

সুখ পর-উপকারে, তারি মাঝে খোঁজ ভাই !

‘আমিত্ব’কে বলি দিয়া স্বার্থ ত্যাগ কর যদি,

পরের হিতের জন্য ভাব যদি নিরবধি !

নিজ সুখ ভুলে গিয়ে ভাবিলে পরের কথা,

মুছালে পরের অশ্রু – ঘুচালে পরের ব্যথা !

আপনাকে বিলাইয়া দীনদুঃখীদের মাঝে,

বিদূরিলে পর দূঃখ সকালে বিকালে সাঁঝে !

তবেই পাইবে সুখ আত্মার ভিতরে তুমি,

যা রুপিবে - তাই পাবে, সংসার যে কর্মভূমি !